যেভাবে হলো সুখনীড়ের নির্বাচন: তফসিল থেকে পুনর্মিলন

সুখনীড় ফ্ল্যাট ওনার্স কল্যাণ সমিতির নির্বাচন শেষ হয়েছে এক মাস আগে। চৌদ্দটি ফ্ল্যাটের এই ভোটে সভাপতি পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন আনোয়ার চৌধুরী (৬২), এক ভোটের ব্যবধানে। পরাজিত প্রার্থী আব্দুল মান্নান (৫২) এখন সমিতির কোষাধ্যক্ষ। নির্বাচনের পুরো ঘটনাক্রম পর্যালোচনা করেছে দৈনিক সুখনীড় সমাচার।
ঘটনার শুরু বার্ষিক সাধারণ সভা থেকে। ওই সভায় ডিজেলের একটি বিল উপস্থাপন করা হয়, যার হিসাব পরে আর কেউ মেলাতে পারেননি। একই সময়ে সভাপতি ভবনে সাতটি সিসিটিভি ক্যামেরা বসান। ফুটেজ দেখার মনিটর রাখা হয় তার নিজের ফ্ল্যাটে।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেন সভাপতি নিজেই। ভোটকেন্দ্র নির্ধারিত হয় সভাপতির বসার ঘর। সভাপতির ভাষ্য অনুযায়ী জায়গাটি নিরপেক্ষ, কারণ সেখানে ক্যামেরা আছে। এর আগে ভবন ব্যবস্থাপক বাতেনকে (৪০) বাসিন্দাদের মতামত সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার জমা দেওয়া প্রথম খরচের হিসাবে সাতচল্লিশ কাপ চা দেখানো হয়েছিল।
তফসিলের পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান। তার প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল সমিতির হিসাব সভাপতির হাত থেকে সরিয়ে নিজের হাতে আনা। প্রচারণার অংশ হিসেবে তিনি একটি নির্বাচনী বুফে আয়োজন করেন। সেখানে আজীবন সদস্য করিম বক্সী (৫৫) পাঁচ প্লেট খাবার গ্রহণ করেন এবং দুই প্রার্থীকেই সমর্থনের কথা জানান।
সভাপতিও পাল্টা ইশতেহার দেন। ভবনের তরুণেরা ছাদ খোলাসহ কয়েকটি দাবিতে প্রতিবাদের ঘোষণা দিলে সভাপতি একটি "ইয়ুথ অ্যাডভাইজরি কমিটি" গঠন করেন। প্রতিবাদের প্রধান উদ্যোক্তা তৃতীয় তলার বাসিন্দা তানিয়াকে (২২) কমিটির চেয়ার করা হয়। কমিটির কাজ দাবি গ্রহণ করা। এরপর আর কোনো প্রতিবাদ হয়নি। ছাদ খোলা হয় নির্বাচনের পরে, এবং দেখা যায় তালাটি কখনো বন্ধই ছিল না।
প্রচারণার শেষ সপ্তাহে করিম বক্সীর দরজায় দুই প্রার্থীর পোস্টারই লাগানো ছিল। একই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নিজেকে একটি চরিত্র সনদ দেন, যাতে সই ও সিল দুটোই তার নিজের।
ভোটের আগের রাতে ভবন ব্যবস্থাপক দুই প্রার্থীর কাছে আলাদা জরিপ প্রতিবেদন জমা দেন। একটিতে মান্নানের ভোট নয়টি, অন্যটিতে সভাপতির সাতটি। দুই প্রতিবেদন মিলিয়ে চৌদ্দ ফ্ল্যাটে ভোট দাঁড়ায় ষোলোটি। একই রাতে "সুখনীড় Family (Official) Final 3" নামে নতুন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়।
ভোট হয় ৭ সেপ্টেম্বর, সভাপতির বসার ঘরে। দিনভর ভবনের লিফট বন্ধ ছিল। ভবনের নিরাপত্তাকর্মী জানান, লিফট বন্ধ ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের তলাগুলোতে। সভাপতি একে যান্ত্রিক ত্রুটি বলে উল্লেখ করেন। করিম বক্সী ব্যালটে দুই প্রার্থীর নামেই টিক দেন। তার ব্যালট বাতিল ঘোষণা করা হয়। ফলাফল: আনোয়ার চৌধুরী সাত ভোট, আব্দুল মান্নান ছয় ভোট।
ফল ঘোষণার পরদিন বিজয়ের মিষ্টি বিতরণের দায়িত্ব পান করিম বক্সী। ভবন ব্যবস্থাপক কে কাকে ভোট দিয়েছেন সেই তালিকা ধরে মিষ্টি ভাগ করেন। গোপন ব্যালটে এমন তালিকা কীভাবে তৈরি হলো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তালিকা আছে। করিম বক্সী সব মিষ্টি বিলি করেন। নিজে একটিও পাননি।
১০ সেপ্টেম্বর সভাপতি পরাজিত প্রার্থীকে আলিঙ্গন করে কোষাধ্যক্ষ ও উন্নয়ন উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেন। সমিতির সিল তুলে দেওয়া হয় তার হাতে। এ সময় সভাপতি বলেন, "আমি চেয়ার নিছি, তুমি টাকা নিছো।" দুজন শুরু থেকেই অংশীদার ছিলেন কিনা, এ প্রশ্নের জবাব কেউ দেননি। ডিজেল বিলের নিরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয় নতুন কোষাধ্যক্ষকেই।
অনুষ্ঠানের শেষে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী মন্তব্য করেন, চাবি সবসময় একই গোছার, মানুষ বদলায়, তালা বদলায় না। সভাপতি মন্তব্যটিকে গেটের চাবি প্রসঙ্গে বলে গ্রহণ করেন এবং তাকে দুইশো টাকা বকশিশ দেন।
নির্বাচনের পর থেকে এ পর্যন্ত ভবনের সার্ভিস চার্জ একাধিকবার বেড়েছে। সিলের বাক্সটি এখনো সভাপতির আলমারিতে।
পুরো ঘটনাক্রম নিয়ে আড়াই মিনিটের একটি কার্টুন প্রকাশ করেছে সুখনীড় টাওয়ার পেজ।